Tuesday, 11 October 2016

আবার আসিস, মা!

পুজোর পাঁচটা দিন জুড়ে মাটির মূর্তিগুলো হয়ত নেহাতই উপলক্ষ্য মাত্র। হাসি ঠাট্টা, নাচ গান আনন্দ, মায়ে ফ্যাশন-শো আর র‍্যাম্প ওয়াক, সবাই মিলে খুব খানিকটা ভালো থেকে নেওয়া। চুটিয়ে!




কলকাতা স্টাইলে বিরিয়ানি আর ফুচকা, হ্যাঁ। এই পরবাসের মরুভূমিতে বসে। দুপুরে হাঁড়ি-ভাঙ্গা শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি প্রতিযোগিতা। বসে আঁকো!




কলা-বউ স্নান করানো। সন্ধিপুজো, মাঝরাত্তিরে জেগে বসে থাকা। একশো আটটা প্রদীপ। অষ্টমীর দিন অবধারিত ভাবে – “ঠাকুর মশাই, আর অনেকে বাকি আছে, আরেক রাউন্ড অঞ্জলি দিইয়ে দিন, প্লীজ।




সন্ধ্যেবেলায় কিশোর-কণ্ঠী, মান্না-কণ্ঠী। বাজেট থাকলে কুমার শানু, নিজে। আর তারপর মাঝরাত করে চিত্তরঞ্জন পার্ক। গিয়ে দেখি ওমা, গেটের বাইরে একটা মস্ত গোদরেজের তালা। দুর্গাপুজোয় তালা পরে এই প্রথম দেখলাম!” – রাত দ্বিপ্রহরিক গজগজানি। আর তারপর গেটের বাইরে পুলিসকে ব্যাকগ্রাউন্ড করে আঁচল মেলে সেলফি। পাঁচজন মিলে কাড়াকাড়ি “এই সর, আমাকে দেখা যাচ্ছে না।“


নবমির দিন ধুনুচি-নাচ। সব ভুলিয়ে দেওয়া ঢাকের দমক। ঢাকিদের কি যেন একটা ভর করে সেই সময়, সত্যি বলছি। অলৌকিক লাগে, মনে হয় বুঝি অন্য কোথাকার মানুষজন এরা, এ পৃথিবীর নয়! ধুনুচির ধোঁয়ায় চোখ পুড়ে যায়। জুড়িয়ে আসে চোখ। 




রাতে বাড়ি ফেরার সময় পরেরদিন সক্কাল সক্কাল চলে আসার তাগাদা – “ঠিক ন’টায় কিন্তু বরণ শুরু হয়ে যাবে!” মিষ্টি, পান-সুপুরি, আর বচ্ছরকারের এক কৌটো সিঁদুর। আরেকদফা হোলি খেলা, ভর অক্টোবার মাসে।



আর ঠিক তারপরেই, কেমন ঝুপ করে নেমে আসে আচমকা, অপ্রস্তুত একটা বিদায়ক্ষণ!


তিন মাস ধরে পুজোর মিটিঙে যে যতই “ধুর বাবা, পরেরবারে আর এত ঝক্কি নিতে পারব না বাবা” করুক না কেন, এই সময়টা বড্ড বিচ্ছিরি! মানে, একটা অদ্ভুত রকমের বিচ্ছিরি! বিষণ্ণ। বিষাদময়!




বাস ভর্তি করে যমুনা যাওয়ার পথে সেই বিষণ্ণতার অস্বস্তি কাটাতে আমরা সবাই কেমন যেন মরিয়া হয়ে পড়ি! অন্ত্যাক্ষরি, ডাম্ব-স্যারাড, পুরনো বাংলা গানের প্যারোডি, পি-এন-পি-সি...  এক এক করে শুরু হয়ে সব খেলাই ঝিমিয়ে পরে বড় দ্রুত। সবারই নিজের ভিতরে একটা অন্য খেলা চলছে আসলে। কিন্তু আমরা সবাই স্বাভাবিক সামাজিকতায় দুর্বলতাকে স্থান দিতে শিখিনি কোনদিনই, আর তাই মনের সাথে যুদ্ধ করে ক্ষণে ক্ষণে আন্দোলিত হয় সুরেলা স্লোগান – বলো বলো দুর্গা মাঈকি!


শুকিয়ে যাওয়া কণ্ঠস্বরগুলো নিয়ম মেনে গলা মেলায় যথারীতি।





বাসের জানলার কাঁচ দিয়ে দেখি, পাশ দিয়ে ট্র্যাফিকের এগোনো-পিছোনোর তালে তালে কখনো কখনো মূর্তি-বাহক ম্যাটাডোরগুলো আমাদের এসি বাসের ছাঁদ ছোঁওয়া জানলার কাঁচের ঠিক পাশটিতে এসে দাঁড়ায়। স্রেফ একটা স্বচ্ছ কাঁচের ব্যবধান।




“বাড়ালেই হাত ছোঁওয়া যায়, সংশয় তবু ঘোচেনা।“


সিঁদুর লেপ্টানো, মুখ ভর্তি মিষ্টি আর গর্জনতেলে মাখামাখি উজ্জ্বল, ছল-ছল চোখ দুটো দেখে বড্ডো অন্যরকম লাগে। মায়া? হয়ত তাই!


“হতে পারে এটা অভিনয়, তবু এই টুকু মন্দ নয়।“




হয়ত, নেহাতই অবুঝ সেন্টিমেন্টের বশে, নিজের যাবতীয় বিশ্বাস অবিশ্বাসকে অতিক্রম করে হঠাৎই এই বিশাল, বারো হাত উঁচু মাটির মূর্তিটাকে – কেমন জানি – “মা” বলে ডাকতে ইচ্ছে করে।


হয়ত স্রেফ মনের আবহাওয়া বদল। তবু! তবু, এই মুহূর্তটুকুতে তো এটাই সত্যি যে, “মা” চলে যাচ্ছে।




আর তাই, হয়ত এই মুহূর্তটুকুর  জন্যেই, তবু, বিরহের যন্ত্রণাটা লজিকের বাধা আর বাঁধতে পারেনা। মন্ত্রমুগ্ধের মতন – নিজেরই অগোচরে যেন – কোলের ওপরে ফেলে রাখা হাত দুটো জুড়ে নিয়ে অস্ফুটে বলে উঠিঃ



“আবার আসিস, মা!”